দ্যা স্পিড ডু অর ডাইঃ মরা-বাঁচার এক অনবদ্য (!) কাহিনী!

বাংলা সিনেমার সময়কালকে দু’ভাগে ভাগ করা যায় – “খোঁজ-দ্যা-সার্চ এর আগের সময়” এবং “খোঁজ-দ্যা-সার্চ এর পরবর্তী সময়”। যারা অবাক হয়ে ভাবছেন যে খোঁজ-দ্যা-সার্চ আবার কী বস্তু – তারা দয়া করে এখান থেকে ঘুরে আসুন, বহুৎ ফায়দা হবে। খোঁজ-দ্যা-সার্চ নামের সেই কালোত্তীর্ণ মহাকাব্যের পর বাংলার মহানায়ক জলিল (ওরফে অনন্ত) বঙ্গবাসীর জন্য নিয়ে এসেছেন তার নতুন রোমান্টিক-সামাজিক-অ্যাকশন-মেলোড্রামা-সাইফাই-মিস্টেরিয়াস-সাইকোথ্রিলার-ফ্যান্টাসি ছবি “দ্যা স্পিডঃ ডু অর ডাই”। এতটুকু বললে আসলে কম হয়ে যায় – এই ছবিকে ইচ্ছা করলে দেশপ্রেম ভিত্তিক ছবি, কিংবা স্পোর্টস ছবি বা হরর এমনকি লাইভ অ্যাকশন অ্যানিমেশন ক্যাটাগরিতেও ফেলা সম্ভব। ইনফ্যাক্ট সব ধরণের ক্যাটাগরিতেই একে ফেলা সম্ভব। কী নেই এই সিনেমাতে! নায়ক, নায়িকা, অতি পাকনা শিশু শিল্পী, ধুমসি সাইজের চাকরাণী, স্যুট পড়া  ড্রাইভার, ম্যান ইন ব্ল্যাক বডিগার্ড, বাংলাদেশী পুলিশ, মালয়শিয়ান পুলিশ, অনেক প্লেন, বিশাল গাড়ির বহর, আলিশান সব বাড়ি, বিদেশী হোটেল, বিদেশী রেস্টুরেন্ট, অতিমানবীয় নাচ-গান, স্পিড বোট, জেটস্কি, ক্রুজার, মোটর বাইক, দুর্ধর্ষ ভিলেন, সাথে ফাউ ফাউ মহিলা ভিলেন, ভিলেনের সাঙ্গপাঙ্গ, বিশাল ভিলেন বাহিনী, ঘোড়া, ডাক্তারের দল, সমুদ্র, অস্ত্র, ডিজিটাল ঘড়ি, গ্যাস চেম্বার – এলাহী কারবার! এক কথায় লিখে শেষ করা যায়না। সিনেমার ক্যাটাগরি বিশ্লেষনে একটু পর আসছি। তার আগে সিনেমা সম্পর্কে বলে নেই। এ বিষয়ে কোন ভুল নেই যে এই সিনেমা এখন পর্যন্ত “খোঁজ-দ্যা-সার্চ এর পরবর্তী সময়” এর সিনেমাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অপরিহার্য সিনেমা হিসেবে বিবেচিত হবে।

“দ্যা স্পিডঃ ডু অর ডাই” দেখতে গিয়েছিলাম বসুন্ধরার স্টার সিনেপ্লেক্সে। সন্ধ্যা সাতটার শোতে বন্ধুদের দলবল নিয়ে হাজির হয়ে দেখি বিশাল লম্বা লাইন দিয়ে লোকজন হলে ঢুকছে। ঢুকতে ঢুকতেই বুঝতে পারলাম পুরো হাউজ ফুল! শুরু হল সিনেমা। প্রথম ধাক্কাতেই নায়ক অনন্তের জিমনেশিয়ামে ব্যয়াম করার দৃশ্য ফুটে উঠে। সাথে সাথেই দর্শকরা আনন্দে চিৎকার-হাততালি দিয়ে ফেটে পড়ে। অনন্ত যে কতটা হিট সেটা বুঝতে আর বাকী রইলনা আমার। এ সিনেমাতে অনন্ত হচ্ছে এজিআই গ্রুপের কর্ণধার – অনন্য। এজিআই গ্রুপ সম্ভবত জলিল সাহেবের নিজের প্রতিষ্ঠান (এ তে আব্দুল, জে তে জলিল, আই তে ইন্ডাস্ট্রিজ)। দুধ-ঘি খাওয়া শরীরের উপর নির্যাতন (যা আমরা সাধারণভাবে ব্যয়াম হিসেবেই জানি) শেষে  অনন্য যখন অফিসে যাবার জন্য তৈরি তখনই খবর পায় বাবা-মা মরা তার একমাত্র ভাইঝি দৃষ্টি রাগ করে বিছানায় শুয়ে আছে। দৃষ্টি হচ্ছে অনন্তের সবকিছু, তাই রাগ ভাঙানোটা অফিসের চেযে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। রাগ ভাঙাতে অনন্য দৃষ্টির রুমে ঢুকে – আর আমরা দেখি দৃষ্টির বিছানার দু’পাশে দশাসই সাইজের দুইজন আয়া স্কুল ড্রেস পড়ে খাবার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। বিশালাকার দুই আয়া অবশ্য পুরো ছবিতেই স্কুল ড্রেস পড়ে এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যে বিচরণ করেছে – এর কারণটা যে কী তা অবশ্য বোঝা যায়নি। যাই হোক, অনন্য দৃষ্টির রাগ ভাঙিয়ে যখন গাড়িতে উঠতে যাবে তখন দেখে এক এমবিএ গ্রাজুয়েট চাকরি না পেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে। অনন্য তাকে নিজের কম্পানিতে চাকরি দিয়ে দেয়। এ থেকে আমরা বুঝি যে নায়ক অতি অতি দয়ালু ও ভাল লোক। তবে এই ভালো লোক যেখানেই যায়, সাথে করে কেন যে তিন গাড়ি ভর্তি ভয়ানক অস্ত্রে সজ্জিত বডিগার্ডের বিশাল বহর নিয়ে চলে – সেটাও এক বিস্ময়! তবে খারাপ লোকও আছে। এই খারাপ লোকদের নেতা হচ্ছে কিবরিয়া খান (আলমগির)। সে দুই নাম্বারি ব্যবসা করে, কিন্তু সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যবসায়ী অনন্য’র কম্পানির কাছে তার কম্পানি খালি ধরাশায়ীই হয়ে যাচ্ছে। তাই সে সিগারেট চুষতে চুষতে তার মত পোড় খাওয়া আরো কয়েকজন দুনম্বর ব্যবসায়ীর সাথে বসে মিটিং করে ঠিক করে যে যেভাবেই হোক অনন্যকে তার পথ থেকে সরিয়ে দিতে হবে। সে ফোন দিয়ে তাই অনন্যকে হুমকি দেয়, কিন্তু অনন্য তার হুমকিকে ‘চো পানি’ (সো ফানি) বলায় কিবরিয়া ক্ষেপে গিয়ে লাল দলের সর্দার কোবরাকে পাঠায় অনন্যকে খুন করতে। এখানে উল্লেখ্য যে অনন্যর সব লোক ম্যান ইন ব্ল্যাক, কিবরিয়ার সব লোক ম্যান ইন ব্লু আর কোবরার সব লোক ম্যান ইন রেড। তো অর্ডার পেয়ে কোবরা এক হুমকি দিয়ে বাজুকা নিয়ে রাস্তায় নায়কের গাড়ির বহরের একটা একটা করে গাড়ি উড়িয়ে দিতে থাকে, একসময় নায়কের ম্যান ইন ব্ল্যাক মরে সাফ হয়ে গেলে অনন্য গাড়ি থেকে বের হয় দু’হাতে দুই পিস্তল নিয়ে এবং স্বাভাবিকভাবেই বৃষ্টির মধ্যে ব্যাপক মারামারি করে সবাইকে পিটিয়ে কাবাব বানিয়ে কোবরার লাশ কিবরিয়ার টেবিলে আছাড় দিয়ে ফেলে কিবরিয়াকে ‘মাইন্নিট’ (মাইন্ড ইট) বলে হুমকি দিয়ে যায়।

এদিকে পাকিস্তান এয়ারওয়েজ করে নায়িকা সন্ধ্যা মালয়শিয়া থেকে দেশে আসে। তারপর  যথারীতি নায়ককে দেখে তার রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়, ঘটনাচক্রে দৃষ্টির মন জয় করে ফেলে, এবং স্বাভাবিকভাবেই নায়কের সাথে তার বিয়ে হয়ে যায়। ইন্টারন্যাশনাল ভিলেন অ্যান্ড্রুও (ওরফে এনায়েত) পাকিস্তান এয়ারওয়েজ করে ঢাকায় আসে অনন্যকে শায়েস্তা করতে। সবাই কেন যে পাকিস্তান এয়ারওয়েজ ব্যবহার করে কে জানে! ওদিকে নায়ক-নায়িকার বিয়ের পর হানিমুনে দৃষ্টিসহ তিনজন কুয়াকাটায় (কিংবা কক্সবাজারও হতে পারে) গেলে সেখানে নাচ-গানের শেষ পর্যায়ে কিবরিয়ার লোকদের বিশাল আক্রমনের মুখে নায়িকা ও দৃষ্টি দিশেহারা হয়ে ছুটোছুটি করতে থাকে আর নায়ক একের পর এক ডিগবাজি দিয়ে যেতে থাকে। কী সেই ডিগবাজীরে বাবা! সামনে-পিছে-ডানে-বামে-উপর-নীচ কোন দিক আর বাদ পড়েনি, সব দিকেই টানা ডিগবাজি দিয়ে নায়ক যখন ভিলেন বাহিনীকে প্রায় উষ্ঠা মেরে দিচ্ছিল – ঠিক সেসময় দৃষ্টি পেটে গুলি খেয়ে যায়। নায়ক সাথে সাথে তাকে পাঁজাকোল করে কুয়াকাটা থেকে এক ঝটকায় ঢাকায় এনে হাসপাতালে ভর্তি করায়। কিন্তু কপাল খারাপ, গুলি খাওয়া রুগীকে কুয়াকাটা থেকে ঢাকা আনার পর ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে। সাথে সাথে নায়ক আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে হেসে উঠে। দর্শকরা সব এক মুহুর্তের জন্য ভেবড়ে গেল, এই দৃশ্যে তো কান্নাকাটি করার কথা, হাসাহাসি হচ্ছে কেন? কিছুক্ষণ পর বোঝা গেল আসলে নায়ক কাঁদছে ঠিকই, কিন্তু তার অদ্ভুত অভিনয়শৈলীর জন্য কান্নাটাকে হাসি বলে মনে হচ্ছে। কী আর করা! নায়কের সাথে গলা মিলিয়ে হলভর্তি দর্শকও হেসে উঠল। এদিকে দৃষ্টিকে হারিয়ে সবাই মনমরা হয়ে আছে (স্কুলড্রেস পড়া দশাসই দুই আয়াও এর মাঝে আছে), এমন সময় কিবরিয়া ফোন দিয়ে অনন্যকে নিয়ে তামাশা করে। অনন্য পাল্টা হুমকি দিয়ে ফোন রেখে বউ নিয়ে ফুরুৎ করে মালয়শিয়া চলে যায়। মালয়শিয়া এয়ারপোর্টে নামার সাথে সাথেই একগাদা ম্যানইন ব্ল্যাক লোক অস্ত্র তাক করে অনন্য ও তার বউকে ঘিরে ফেলে, পর মুহুর্তে জানা যায় যে তারা আসলে অনন্যর বডিগার্ড (বডিগার্ড কেন মালিকের দিকে পিস্তল তাক করে রাখে সেটা একটা আজব ব্যাপার)। যাই হোক, কিবরিয়া আর অ্যান্ড্রুও মালয়শিয়া চলে গিয়ে মালয়শিয়ান আরো তিনজন ডনের সাথে ভাব জমিয়ে ল্যাপটপে মুভি দেখতে দেখতে অনন্যকে কব্জা করার প্ল্যান করে ফেলে। প্ল্যান অনুযায়ী অনন্য’র বউকে কিডন্যাপ করা হয় আর বিশাল যুদ্ধ শেষে ডিগবাজীরত অনন্য’র বুকে গুলি করা হয়। তবে শরীরে অতিরিক্ত চর্বি থাকায় গুলি হৃদপিন্ড পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। একদল ডাক্তার অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে চর্বি সরিয়ে সেই গুলিখানা বের করে আনে। হাসপাতালের বেডে অনন্য যখন দাড়ি শেভ করছিল, তখন ভিলেন বাহিনী তাকে একটা ডিজিটাল ঘড়ি আর ম্যাসেজ পাঠায়। ম্যাসেজে বলা ছিল যে তার বউকে একটা কাঁচের ঘরে আটকে রাখা আছে যাতে ঠিক পাঁচদিনের অক্সিজেন দেয়া আছে। ঐ কাঁচের ঘর খুলতে হলে পাঁচ ডনের রেটিনাস্ক্যানের কপি লাগবে। আর পাঁচদিনের মাঝে বের করতে না পারলে কার্বনডাই অক্সাইডের ঠ্যালায় তার বউ ঐইখানে মারা যাবে। পাঁচদিনের মধ্যে নায়ক পুরো একদিন  কাটালো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বিরহী গান গেয়ে। গানের পরই অনন্য’র সাথে দেখা হয় দ্বিতীয় নায়িকার। এই নায়িকা মালয়শিয়ান, সে তাকে সবরকম সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেয়। এরপর শুরু হয় নায়কের আৎকা অভিযান। নায়ক বিভিন্ন জায়গায় কোন ধরণের ইনফরমেশন ছাড়াই আৎকা গিয়ে উপস্থিত হয় আর আঁইক করে একেক ডনকে কাৎ করে একেকটা রেটিনা স্ক্যান করতে থাকে। এই আৎকা অভিযানে নায়ক চারদিনে দুইবার গুলিও খায়, পুরা ভিলেন বাহিনী  সাফ হয়ে যায়, নায়িকা মুক্তি পায় আর বোনাস হিসেবে দুই নাম্বার নায়িকা পটল খায় মানে পটল তোলে আরকি! তবে নয়িকার মুক্তি পাবার ব্যাপারটা পুরাই আলিফলায়লা! নায়ক পাঁচজনের বদলে চারজনের রেটিনা স্ক্যান করতে পারে (কিবরিয়ার লাশ থেকে কেন যে নায়ক রেটিনা স্ক্যান করতে পারেনাই সেটা এক রহস্য)। কিন্তু নায়িকার গ্যাসচেম্বার খুলতে দরকার পাঁচটা রেটিনার স্ক্যান – এখন উপায়? নায়ক কাঁচের দেয়ালে হাত দিল কাঁচ ভাঙার জন্য। কিন্তু কী কুদরত! কাঁচের মত বিদ্যুৎ অপরিবাহী একটা বস্তু থেকে বজ্রপাতের মত বিদ্যুতের শিখা বের হয়ে নায়ককে ছ্যাঁকা দিল। নায়ক গুলি করে কাঁচ ভাঙার চেষ্টা করল – কুদরতী কাঁচের কিছুই হলনা। কন্ট্রোল প্যানেলে গিয়ে সিস্টেম হ্যাক করার চেষ্টা করল – সেটাও বিফল। কন্ট্রোল প্যানেল গুলি করে ঝাঁঝরা করে দিয়েও দেখা হল কিছুই হল না। শেষমেশ নায়ক তার গলা থেকে কুদরতী এক তাবিজ বের করে, সেটা কাঁচে ছোঁয়াতেই কুদরতী কাঁচের সব কুদরত ডিঅ্যাক্টিভেট হয়ে গিয়ে ভেঙে পড়ে কাঁচ, উদ্ধার পায় নায়িকা, এবং পরমুহুর্তে ধ্বংস হয়ে যায় পুরো বাড়িটা। পুরা আলিফলায়লা স্টাইল!

“দ্যা স্পিডঃ ডু অর ডাই” এর ক্যামেরার কাজ খুবই ভালো হয়েছে, গতানুগতিক বাংলা যেকোন সিনেমার চেয়ে অনেক উন্নত। কিন্তু মুর্খ দর্শক সেটার মর্ম বোঝেনি। যখনই কোন ফ্রেমে অনন্তকে দেখা গেছে, তখনই তারা কোন কারণ ছাড়াই মুহর্মুহু করতালিতে ফেটে পড়েছে। এ সিনেমার গানগুলোর সুরও বেশ ভালো হয়েছে। কিন্তু এখানেও মুর্খ দর্শকরা অনন্তপ্রেমে পাগল হয়ে গানের মর্ম বোঝার চেষ্টা করেনি, তার ভুঁড়িবহুল দাপাদাপিই ছিল তাদের মূল আকর্ষণ। অন্যান্য যেকোন বাংলা সিনেমার চেয়ে এর অ্যাকশন দৃশ্যগুলোও অনেক উন্নত হয়েছে, কিন্তু সেটা বোঝার মত লোকজন তো থাকতে হবে! দর্শকরা অনন্ত’র মারামারিকে থোরাই কেয়ার করে কেবল তার নড়ন্ত বাউন্সি ভুঁড়ির দিকেই নজর দিচ্ছিল। এই সিনেমার শব্দগ্রহনও বেশ উন্নততর করেছে। অথচ দর্শকদের সিনেমাটির শব্দ নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করলে তারা আপনাকে নায়কের মুখনিঃসৃত কিছু কালজয়ী শব্দ শোনাবে, যেমন – ‘ইশ্টুপ’ (স্টপ), ‘কিশটিনা’ (ক্রিস্টিনা), ‘লেটমব’ (লেটস মুভ), ‘আই কোনটাক’ (আই কন্টাক্ট), ‘মাই গোট’ (মাই গড) প্রভৃতি।

এবার আসি প্রথমবার যা বলছিলাম যে, এই সিনেমাকে যেকোন ক্যাটাগরিতে ফেলা যায়। নায়ক-নায়িকা যেহেতু আছে, বোনাস হিসেবে যেহেতু দ্বিতীয় নায়িকা আছে – তাই অবশ্যম্ভাবীভাবেই এটা রোমান্টিক ছবি। এ ছবিতে দেখা যায় নায়িকা অফিসে যেতে লেট করায় তার ভাইকে বাগড়া দেয় এই বলে যে এভাবে লেট করলে ডিজিটাল বাংলাদেশ হবে কিভাবে! তাছাড়া নায়ক নিজেও কঠিন দেশপ্রেমিক – সারাদিন ভয়ানক অস্ত্রে সজ্জিত বিশাল বডিগার্ড বাহিনী নিয়ে ঘুরাঘুরি করে, লন্ডনে তার ব্যাংকের শাখা খুলছেন, দেশের মানুষের জন্য খাবার স্টক করে রাখছেন। তাই এটাকে দেশপ্রেম মূলক ছবি হিসেবেও চালিয়ে দেয়া যায়। সমাজের বিভিন্ন ব্যাপার স্যাপারও এখানে উঠে এসেছে, যেমন – বিদেশ ফেরত নায়িকাকে তার ভাই দেশের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে বোঝায় যে দারিদ্র্য সীমার নীচে বসবাসরত দেশের গরীব লোকজন ধুমায়ে বড়লোক হবার পথে। এ থেকে একে সামাজিক ছবিও বলা যায়। একে আবার অ্যাকশন ক্যাটাগরিতেও ফেলা যায় – কারখানা বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া কিংবা বাজুকা নিয়ে রাস্তায় মারামারি – অতিশয় মুর্খ লোকও বলবেন যে এই সব জিনিস অ্যাকশন ছবির মশলা। নাচ গানের জন্য একে মেলো ড্রামা ক্যাটাগরিতেও ফেলা যায়। প্রচুর স্পেশাল ইফেক্টের কারণে একে লাইভ অ্যাকশন অ্যানিমেটেড মুভি হিসেবেও চালিয়ে দেয়া যায়। প্রায় সময়ই নায়ক হাসছে না কাঁদছে – এরকম একটা গোলক ধাঁধায় ফেলে দর্শকদের প্রচন্ড মানসিক চাপে রাখার জন্য এই ছবিকে সাইকো থ্রিলারও বলা যেতে পারে। অনন্য’র পিলে চমকানো হাসি কিংবা অশরীরি বেশভূষা বা ভৌতিক কন্ঠস্বরের জন্য এই সিনেমাকে অনায়াসে হরর মুভি’র ক্যাটাগরিতে ফেলা যায়। নায়কের পোলো গেম খেলার দৃশ্যের জন্য একে স্পোর্টস ক্যাটাগরিতেও রাখা যায়। তাছাড়া নায়কের অদ্ভুত রহস্যময় বাচনভঙ্গীর কারণে একে মিস্টেরিয়াস ক্যাটাগরির সিনেমা বললেও অত্যুক্তি হবেনা। গ্যাসচেম্বার, ডিজিটাল হাতঘড়ি প্লাস রেটিনা স্ক্যানার ইত্যাদি হাইটেক যন্ত্রপাতি এবং অক্সিজেন ও কার্বন ডাই অক্সাইড শব্দদুটি ব্যবহারের জন্য এ সিনেমাকে সাই ফাই ছবিও মনে হতে পারে। সর্বোপরি শেষদৃশ্যে আলিফ লায়লা স্টাইলে তাবিজ ব্যবহার করে ভিলেনের আলিশান বাড়ি উড়িয়ে দেবার কারণে চোখ বুজে একে ফ্যান্টাসি ছবির মর্যাদা দেয়া যায়।

এবার সিনেমার হাইলাইট। অনন্য’র ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞান অত্যন্ত প্রখর। কারখানায় ঢোকার পর একজন এসে বিশাল একটা যন্ত্র দেখিয়ে বলল যে এটা চলছেনা। সাথে সাথে অনন্য সাহেব হাতে গ্লাভস পড়ে ময়না তদন্তে নেমে গেলেন, এবং শেষ পর্যন্ত যন্ত্রটির পাওয়ার কেবল লাগিয়ে সেটাকে চালু করলেন। আর সিনেমা দেখে এটা অন্তত বোঝা যায় যে জলিল সাহেবের শুধু গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিই নয় বরং লিপস্টিকেরও বিশাল সম্ভার আছে। তাছাড়া এজিআই ইন্ডাস্ট্রির আন্ডারগ্রাউন্ডে তাদের নিজস্ব ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস আছে, যেখানে বসে তারা কেবল নায়ক সাহেবের আসা যাওয়া হাঁটা চলা দেখে। এজেআই গ্রুপের সিকিউরিটি গার্ডরা বসুন্ধরা সিটির মার্কেটের গার্ডদের মত ব্যাটারি ছাড়া মেটাল ডিটেক্টর নিয়ে ঘুরে, যেগুলোতে কম্মিনকালেও কখনো কোন আওয়াজ হয়না। আলমগির সাহেব পুরো সিনেমাটিতে সিগারেটকে খালি নাক দিয়ে শুঁকেই গেলেন, একবার মনে হয়েছিল চোষার চেষ্টাও করেছিলেন, কিন্তু টান কেন দেননাই কে জানে? মনে হয় রোজার সময় শুটিং ছিল। মালয়শিয়ান নায়িকার বলা বাংলা জলিল সাহেবের উচ্চারিত বাংলার চেয়ে অনেক উন্নত – এটার রহস্য কি কে জানে! অনন্য সাহেবের বিশাল কারবার, মিলিয়ন ডলারের নিচে কথা বলেননা, যখন তখন লন্ডনে ব্রাঞ্চ খুলে ফেলেন কিন্তু নিজের বাসাটা আবার এফডিসির শুটিং ফ্লোরে। রহস্যময় ব্যাপার হল মালয়শিয়ান পুলিশ ডিপার্টমেন্ট বাংলাদেশী লোক দিয়ে বোঝাই। এসব বাংলা-কাম-মালয় পুলিশরা মুখে স্নো-পাউডার মেখে থাকে আর সারাক্ষণ কঠিন কঠিন ইংলিশে (ওদের ইংলিশ বুঝিনাই দেখে কঠিন লেগেছে) বুলি আউড়িয়ে কুলু (ওদের কথায় তাই-ই শুনলাম, তবে আমার মনে হয় ওরা Clue এর কথা বলা বলি করছিল) খোঁজে। এবং যথারীতি সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমে অনন্য সাহেবের আগে তার ভুঁড়িই প্রথম প্রবেশ করে।

আপনি এই লেখাটা পড়ে কি বুঝেছেন আমি জানিনা, কিন্তু সিনেমা হলে গিয়ে আমি যে আনন্দটা পেয়েছি তার কানাকড়িও আপনি এই লেখাটা পড়ে পাননি সেটা হলফ করে বলতে পারি! সিনেমা শেষ করে সবাই যখন হাসতে হাসতে হল থেকে বের হচ্ছিল, সিনেপ্লেক্সের অন্যান্য হলের দর্শকরা তখন ঈর্ষান্বিত চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে হাসির বড়ই অভাব। কাউকে হাসতে দেখলে ঈর্ষান্বিতই হবার কথা। তাই প্রাণ খুলে যদি হাসতে চান তাহলে আর দেরী না করে চটজলদি “দ্যা স্পিড – ডু অর ডাই” দেখে আসুন। তবে হাসতে হাসতে অসুস্থ হয়ে পড়লে আমি কোন দায়ভার নেবনা, সেটা একান্তই আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার হিসেবে পরিগনীত হবে।

8 thoughts on “দ্যা স্পিড ডু অর ডাইঃ মরা-বাঁচার এক অনবদ্য (!) কাহিনী!”

  1. ভাই পুরা ছবির মা-বোন করে ছারলেন। তবে আমার কিন্তু প্রথমটা ভালোই লেগেছে। দ্বিতীয়টা আজ দেখার ইচ্ছে আছে।

  2. উপনার যা বডি…জলিল সাহেব কি শুধু নিজেই অভিনয় করে যাবেন নাকি নতুন নায়কদের ও চান্স দিবেন!!

  3. বরাবরের মতই চরম একটা লেখা উপহার দিলেন। :-) সাথে সাথে দেখি দূর্যোধন ভাইও এইটা নিয়ে লিখেছে। www.somewhereinblog.net/blog/nvidia/29598661 দেখি এখানে হলে আসলে এইটা মিস করা যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>