বছর দুয়েক আগে শেষবারের মত নতুন উবুন্টু আপডেট করেছিলাম। সেসময় রিলিজ হয়েছিল উবুন্টু ১০.০৪ – ল্যুসিড লিংক্স। সেই রিলিজটার বিশেষত্ব ছিল যে ওটা লং টাইম সাপোর্ট রিলিজ (সংক্ষেপে এলটিএস রিলিজ) ছিল। এলটিএস রিলিজগুলো অন্যান্য রিলিজের চেয়ে বেশি সময় ধরে সাপোর্ট পায়, অন্য রিলিজগুলো যেখানে দেড়মাস সাপোর্ট পায় সেখানে এলটিএস রিলিজগুলো তিন বছর সাপোর্ট পায়। প্রতি দু’বছর পর পর এলটিএস রিলিজগুলো বের হয়। অলস মানুষ হিসেবে বিশেষ পরিচিতি থাকায় আমি যে ছ’মাস পর পর অপারেটিং সিস্টেম আপগ্রেড না করে প্রতি দু’বছরে একবার করব – সেটা অবশ্য জানা কথা। তাই ল্যুসিডের দু’বছর পর প্রিসাইজ মুক্তি পেয়ে আমার ল্যাপটপ ও ডেস্কটপে ল্যুসিডের বিদায় ঘন্টা বাজিয়ে দিল। বিদায় ল্যুসিড – পুরো দুবছর কোনরকম উপদ্রব না করে আমাকে বিশ্বস্তভাবে সঙ্গ দেবার জন্য অনেক ধন্যবাদ!
এবারে আসি প্রিসাইজের কথায়। উবুন্টু ১২.০৪ এর কোডনেম হচ্ছে – প্রিসাইজ প্যাঙ্গলিন। এর জন্য অপেক্ষা করছিলাম দু’বছর ধরে। ২৬ তারিখ মুক্তি পাওয়ার পর দিনই অফিসে গিয়ে ঝটপট প্রিসাইজ নামিয়ে ফেলি, নামাতে সময় লাগল প্রায় মিনিট বিশেক – তারপর বাসায় এসে ধুপধাপ করে ইন্সটলেশান! এ লেখাটা সেই ইন্সটলের কয়েক ঘন্টার মাঝে লেখা – তাই রিভিউতে অনেক কিছু বাদ থেকে যেতে পারে। তাছাড়া আমি ল্যুসিডের পর সরাসরি প্রিসাইজ ব্যবহার করছি – তাই কিছু কিছু পুরনো জিনিস আমার কাছে নতুন লাগতে পারে, যেগুলো ল্যুসিডের পরের ভার্সনগুলোতে ছিল অথচ আমার জানা নেই।
১২.০৪ – প্রিসাইজ প্যাঙ্গলিন

আমার প্রিসাইজ ডেস্কটপ
আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল যে উবুন্টু এই রিলিজটা দিয়ে তাদের উপর সেঁটে থাকা “অপরিপক্ক” শব্দটা মুছে দিতে চাইছে। আগের এলটিএস রিলিজগুলোর চেয়েও একে বেশ স্ট্যাবল বলে মনে হল। ইন্সটলেশান প্রসেস আগের চেয়ে অনেক সহজ করা হয়েছে – অন্তত ল্যুসিডের তুলনায় প্রক্রিয়াটাকে মামুলিই বলা যায়। পুরো ইন্সটলেশন প্রক্রিয়া শেষ হতে হতে প্রায় মিনিট পাঁচেক লাগল। তারপর একদম শুন্য থেকে পুরোপুরি শুরু হতে প্রিসাইজ আমার পাঁচবছরের পুরনো ডেল ল্যাপটপে মোটমাট ১০ সেকেন্ডের মত সময় নিল। ব্যবহার করতে গিয়ে মন হল আগের রিলিজগুলোর চেয়ে এটি বেশ দ্রুত। এর রেসপন্সও আগের চেয়ে বেশ দ্রততর লাগছে – অ্যাপ্লিকেশনগুলো লোড হতেও বেশ কম সময় লাগছে। বরাবরের মতই আমার ল্যাপটপের সমস্ত কার্ড উবুন্টু প্রথমবারেই ডিটেক্ট করে ফেলেছে। আর ডেস্কটপের সাথে ক্রিয়েটিভের যে ওয়েবক্যামটা আছে, ইন্সটলের আগেই ইউজার আইডি হিসেবে সেটা দিয়ে ছবি তোলা গেল সহজেই।
ইউনিটি গ্রিটার
প্রিসাইজে লগিনস্ক্রিনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন এ লগিনস্ক্রিনটির নাম “ইউনিটি গ্রিটার”। এতে অ্যানিমেশন যোগ করা হয়েছে দেখলাম। তাছাড়া প্রতিটি আলাদা ব্যবহারকারীর জন্য আলাদা ওয়ালপেপারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যবহারকারীর নাম পরিবর্তনের সাথে সাথে পেছনের ওয়ালপেপারও পাল্টাতে থাকবে। বেশ দারুণ লাগছিল ব্যাপারটা।
ইউনিটি
সম্ভবত সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত বিষয় ছিল ইউনিটি – উবুন্টুর নতুন ডিই। ইউনিটি যখন উবুন্টুতে দেয়া শুরু হয় তখন চারদিকে নেতিবাচক সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছিল। তবে আমার নিজের ধারণা ছিল অনেকটা এরকম – ইউনিটি মাত্র যাত্রা শুরু করেছে তখন, একেবারেই শিশু ছিল, এটাকে সময় দিলে আস্তে আস্তে পূর্ণাঙ্গ রূপ মেলে ধরবে। প্রিসাইজে ইউনিটি সেই পূর্ণাঙ্গ রূপটাই মেলে ধরেছে। আমি সবসময়ই ডক ব্যবহার করি। ল্যুসিডে ব্যবহার করতাম গ্নোমডু ডক। ডক ব্যবহার কম্পিউটারে চলতে থাকা অ্যাপগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার কাজটা অনেক সহজ করে দেয়। ইউনিটিতে ডিফল্টভাবে ডক দিয়ে দেয়া থাকে। ফলে আমার কাজটা অনেকটুকু সহজ গেল। আগে আলাদাভাবে ডক ডাউনলোড করতে হত, এখন ইউনিটির সাথেই চলে আসছে ডক (এটাকে অবশ্য লঞ্চার বলা হয়)। ইউনিটি আমার কাছে একদমই নতুন। উইন্ডোজের চিরচেনা পরিবেশ থেকে লিনাক্সে আসার পর উবুন্টুর আনকোরা পরিবেশে বেশ ভাল লাগত। ভালো লাগত কারণ জানা ছিলনা কোথায় কি ঘাপটি মেরে আছে। তাই টেপাটেপি করতাম। টেপাটেপি করতে করতে শিখতাম কোথায় কি আছে – বেশ ভালোই লাগতো ব্যাপারটা। ইউনিটিতেও তাই – আনকোরা চেহারা নিয়ে গুঁতোগুঁতি করতে অন্যরকম আনন্দ পাচ্ছি। ইউনিটির ড্যাশে অবশ্য কোথায় কি আছে তা না জানলেও চলে, উপরের সার্চ বারে অ্যাপ্লিকেশনের নাম লিখলেই অ্যাপ্লিকেশনটা পাওয়া যায়। ইউনিটিকে নিজের মত সাজিয়ে নেবার জন্য বিভিন্ন সেটিংও পরিবর্তন করা যায়। ইউনিটির বহু কিছু এখনো আমার শেখা বাকী। সব মিলিয়ে ইউনিটি আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে – বলা উচিৎ আমি ইউনিটির ফ্যান হয়ে গেছি!
গ্লোবাল মেনু
উবুন্টুতে এখন আর লোকাল মেনু নেই। অর্থাৎ কোন প্রোগ্রামের মেনু সেই প্রোগ্রামের উইন্ডোর উপরের অংশে নেই, বরং পুরো সিস্টেমের (অর্থাৎ গ্লোবালি) টপ প্যানেলে দেখা যাবে। তাছাড়া বাম পাশের উইন্ডো কন্ট্রোল বাটনগুলো এমনিতে অদৃশ্য থাকে, সে জায়গায় অ্যাপ্লিকেশনের নামটা থাকে, কেবল মাত্র কার্সর নিলেই নাটা উঠে গিয়ে কন্ট্রোল বাটন দেখা যায়। আমি অবশ্য গ্লোবাল মেন্যুর ফ্যান। ম্যাক ওএস এ গ্লোবাল মেন্যু দেখে খুব ভাল লাগত, তাছাড়া কাজ করেও আরাম। এখন আমার উবুন্টুতেও ডিফল্টভাবে চলে আসছে এটা – আমার জন্য খুশির খবরই বৈকি!
হুড
এটা একটা দারুণ জিনিস! যেকোন অ্যাপ্লিকেশনের পুরো মেন্যু খোঁজার দরকার নেই, Alt চেপে যেকাজ করতে চাইছেন সেটা টাইপ করলেই অপশনটা চলে আসবে। হয়তো আপনি কোন প্রোগ্রামে New Tab খুলতে চাচ্ছেন, তাহলে শুধু লিখুন “new” বা “new t” বা “new tab” প্রভৃতি। দেখবেন আপনার কাজ হয়ে গেছে।
প্রাইভেসি সেটিংগস
সিস্টেম সেটিংগসে দেখলাম প্রাইভেসি সেটিংগস নামে নতুন অপশন আনা হয়েছে। এখান থেকে ইচ্ছা করলে ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট করে দিতে পারেন যে কোন কোন অ্যাপ্লিকেশন কম্পিউটারে কাজের বিবরণী রাখবে বা রাখবেনা।
অ্যাপ্লিকেশন
নতুন কোন ডিফল্ট অ্যাপ্লিকেশন চোখে পড়লোনা। আগের মতই আঁকাআঁকি ও লেখালেখির জন্য রয়েছে লিব্রা অফিস, গান শোনার জন্য রিদমবক্স (মাঝখানে শুনেছিলাম যে বানশি এসেছিল উবুন্টুতে, এই রিলিজে দেখলাম আবার পুরনো রিদম বক্সেই ফেরত গেছে), মুভি দেখার জন্য মুভি প্লেয়ার, ব্রাউজার হিসেবে ফায়ারফক্স, মেইল ক্লায়েন্ট হিসেবে থান্ডারবার্ড, সোশাল নেটওয়ার্কের ক্লায়েন্ট হিসেবে গুইবার সহ আরো অনেক প্রোগ্রাম। মোট কথা সাধারণ ব্যবহারকারীর প্রয়োজনীয় সবকিছুই আছে এখানে। নেই শুধু গান শোনার বা মুভি দেখার জন্য কোডেক। সেটা ইন্সটল করাও অবশ্য সহজ। এজন্য বামপাশের লঞ্চার থেকে “সফটওয়্যার সেন্টার” এ গিয়ে “ubuntu restricted extra” লিখে খোঁজ করুন, পেয়ে গেলে এক ক্লিকে ইন্সটল করে ফেলুন।
সফটওয়্যার সেন্টার
উবুন্টুর যেকোন অ্যাপ্লিকেশন খোঁজার/ইন্সটলের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জায়গা হচ্ছে এই সফটওয়্যার সেন্টার। বাম পাশের লঞ্চারে Software Center নামে যে আইকনটি আছে সেটা ক্লিক করলেই এই প্রোগ্রামটি ওপেন হবে। এবার দেখলাম বেশকিছু পয়সা দিয়ে কিনতে হবে এমন অ্যাপসও এসেছে। তাছাড়া উবুন্টু ওয়ানের ইউজার আইডি ব্যবহার করে সফটওয়্যার রিস্টোরের একটা অপশনও দেখলাম।
বাংলা পড়া-লেখা
বরাবরের মতই অসাধারণ বাংলার সাপোর্ট নিয়ে এসেছে এই রিলিজটিও। বাংলায় লেখার জন্য এতে রয়েছে দুটি কি বোর্ড লেয়াউট – জাতীয় এবং প্রভাত। অভ্র ফনেটিক এটাতে পরীক্ষা করে দেখা হয়নি বলে বলতে পারছিনা অভ্রের পারফর্ম্যান্স কেমন। বাংলা পড়াও যায় ঝকঝকে, এজন্য আলাদা কিছুই করতে হয়না।
আমার কাছে ভালো লাগা দিক:
- বেশ ফাস্ট রেসপন্স করছে সকল অ্যাপস গুলো।
- ইউনিটি নিয়ে আসায় উবুন্টু অন্যান্য ডেস্কটপ ডিস্ট্রগুলো থেকে প্রায় পুরোপুরি স্বাতন্ত্র্য হয়ে গেছে বলে বলা যায়।
- ফায়ারফক্স, লিব্রাঅফিস সহ প্রায় সব সফটওয়্যারেরই লেটেস্ট ভার্সনটা ব্যবহার করা হয়েছে।
- বরাবরের মতই বিনা ক্লেশে বাংলা পড়তে ও লিখতে পারা যাচ্ছে।
- আমার সনিএরিকসন এক্সেরিয়া আর্ক এস কে একেবারে মডেল নাম্বার সহ ডিটেক্ট করতে পারছে।
আমার কাছে কম ভালো লাগা দিক:
- ইউনিটির আরেকটু ম্যাচিউরিটি দরকার। আশা করছি সামনের রিলিজগুলোতে এটা আরো ডেভেলপড হবে।
- লিব্রা অফিস এখনো গ্লোবাল মেনু সাপোর্ট করেনা।
- “উবুন্টু টুইক” বা এই টাইপের শক্তিশালী একটা সিস্টেম ম্যানেজার ডিফল্টভাবে দেয়া দরকার ছিল।
- ডিফল্ট আইকন সেট পাল্টানো জরুরি ছিল, কিন্তু সেটা করা হয়নি।
এবার আসি এই লেখাটার নামকরণ এমন কেন? বাংলাদেশী উবুন্টু ব্যবহারকারীদের আমি বন্টু বলে সম্বোধন করি। আর বন্টু হিসেবে ১২.০৪ রিলিজটা আমাকে নিশ্চিন্ত করে রাখবে অন্তত সামনের আরো দুটি বছর। তাই আমার জন্য সামনের সময়টা কেবলই বন্টু বর্ষ যার শুভদিন শুরু আজ থেকে।
অনেক তো রিভিউ পড়লেন, এবার নিজেই বরং একটু পরখ করে দেখুন – উবুন্টু বস্তুটা কেমন! প্রিসাইজ প্যাঙ্গলিন ডাউনলোড করুন এখান থেকে। তারপর নিজেই না হয় জানিয়ে যান কেমন লাগল আপনার কাছে!
সবাইকে শুভ বন্টুবর্ষ ১২০৪!





