মোবাইল ফোন নিয়ে আমার অনুভূতি ব্যাপক ধরণের। যেমন খুব ছোটবেলায় মোবাইল ফোন দেখে খুব আশ্চর্য হবার অনুভূতি হত। তার ছাড়া এক হাত সমান একটা ফোন যেখানে সেখানে নিয়ে যাওয়া যায়, তারের কোন বালাই নেই – ব্যাপারটা আমাকে বেশ অবাক করতো। তারপর দেখলাম মোবাইল ফোন পকেটে পুরে ফেলার মত সাইজের হয়ে গেল – আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। এরপর কলেজে যাবার পর দেখি পুরো কলেজে হাতে গোনা দু’একজন সহপাঠি মোবাইল ফোনও ব্যবহার করে – তাদের দেখে আমি হিংসায় জ্বলতাম, কবে যে আমার একটা মোবাইল ফোন হবে! প্রথম মোবাইল ফোন হাতে পাই ভার্সিটিতে গিয়ে। বাসার পুরনো ম্যাক্সন এমেক্স-৬৮৭৯ ফোনটার নতুন মালিক হলাম আমি। হোক পুরনো, ফোনটার মালিক হয়েই এক অদ্ভুত অনুভূতিতে মন ভরে গেল, মনে হল আমি শেষমেষ জাতে উঠেই গেলাম। সেই যে শুরু এরপর জীবনে মোবাইল ফোন খুব একটা কম ব্যবহার করিনাই (সিরিয়াল করলে এই মুহুর্তে ছয় নম্বরখানা ব্যবহার করছি)। ম্যাক্সন ব্যবহার করেছিলাম সবমিলিয়ে ৬/৭ মাসের মত। এরপরে হাতে আসে আমার মোবাইল জীবনের দ্বিতীয় ফোন – সনি এরিকসন টি ২০০।

আমার দ্বিতীয় ফোনটা আসলে আমার ফোন ছিলনা, ওটা ছিল ছোটমামার ফোন। চমৎকার স্টাইলিশ একটা ফোন ছিল। ঐ ফোনটা দেখে লাজ শরমের মাথা খেয়ে এমন ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকতাম যে একদিন ছোটমামাই আমার হাতে ফোনটা তুলে দেয়। আমার খুশী আর দেখে কে! এর মাঝেই ছোটমামার নিজের মোবাইল ফোন হারিয়ে যাওয়ায়, প্রায় বছরখানেক ব্যবহারের পর সনি এরিকসনটা আবার আসল মালিককে ফিরিয়ে দেই। তবে কীনা আমার নিজেরও লাভ ছিল এতে, কারণ বিনিময়ে আব্বুর কাছ থেকে পেলাম নকিয়া ৬১০০ – আমার তৃতীয় ফোন এবং প্রথম রঙিন ফোন! রঙিন ফোন হাতে নিয়ে আমি আরেক দফা জাত উঠে গেলাম। নকিয়া ৬১০০ যখন পাই তখন আমি আইইউটির সেকেন্ড ইয়ারের অর্ধেক পার করে দিয়েছি। আইইউটির শেষ সময় পর্যন্ত এই ফোনটা ছিল আমার নিত্য সঙ্গী। আইইউটি থেকে নিজের নামের আগে ‘মিস্তিরি’ খেতাব লাগাবার পারমিশন পাওয়ার খুশিতে বড়মামা আমাকে চতুর্থ ফোন খানা গিফট করল। ফোনটা ছিল নকিয়া ৬৬৮০। দারুণ একটা ফোন ছিল। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল ফোনটা দেখতে প্রায় সেসময়ের ক্রেজ নকিয়া এন সিরিজের ফোনগুলোর মত। লোকজন স্বাভাবিকভাবেই মনে করত যে এন সিরিজের ফোন ব্যবহার করছি (এবং প্রায়ই বেশ হিংসাত্মক চোখে আমার ফোনটা দেখত)। এই ফোন সেটটা আমার সাথে ছিল লম্বা একটা সময় ধরে। ইউরোপে যখন ছিলাম তখনও ঐ ফোনটাই ছিল আমার সঙ্গী। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে আমার কাছে ছিল ফোনটা। গত বছর দেশে ফেরার সপ্তাহখানেক আগে হঠাৎ করেই গোলমেলে আচরণ করা শুরু করল ফোন সেটটা। ঠিকঠাক মত কথা শোনা যায়না, যখন তখন রিবুট হতে থাকে – আরো অনেক সমস্যা নিয়ে একসাথে হাজির হল আমার প্রিয় সেটটা। তড়িঘড়ি করে তখন মামার পুরনো এলজি কুকি সম্বল করেই দেশে চলে আসি। হিসেব মত এলজি কুকি তাহলে আমার ব্যবহৃত পঞ্চম ফোন সেট এবং আমার জীবনের পয়লা টাচ স্ক্রিন সেট।
কুকি’র সাথে একটা স্টাইলাস পেন থাকলেও সেটা ব্যবহার না করে নিজের তর্জনীকেই স্ক্রিন টাচ করার কাজে ব্যবহার করতাম। ফোনটা কখনোই কোন ঝামেলা করেনি, তবে রেসিস্টিভ টাচ স্ক্রিন বলেই কী না কে জানে সেটটা আমাকে সেভাবে টানতে পারেনি। অনেকদিন ধরেই একটা অ্যান্ড্রয়েড সেটের মালিক হবার শখ হচ্ছিল। অবশেষে বহু প্রতীক্ষার পর দিন কয়েক আগে সেটাও আল্লাহ রহমতে পূরণ হয়ে গেল – কেনা হল ষষ্ঠ মোবাইল ফোনটা। আগের ফোনগুলোর কোনটাই আমার নিজের পছন্দসই কেনা ছিলনা। তাই এবার নিজের পছন্দমত মোবাইল ফোন কেনার পর সম্পূর্ণ নতুন এক ধরণের অনুভূতি হচ্ছে – যেটা প্রকাশ করার সঠিক শব্দটা এখনো জানিনা বলে লিখতে পারলামনা।
পোস্টের টাইটেলেই বলে দিয়েছি – আমার নতুন ফোনটা অ্যান্ড্রয়েড ফোন। সেটটা হচ্ছে সনি এরিকসনের এক্সপেরিয়া আর্ক এস। নিশ্চয়ই মাথায় প্রশ্ন আসছে যে – অ্যান্ড্রয়েড বলতে যেখানে সবাই স্যামসাং আর এইচটিসি বোঝে, সেখানে সনি এরিকসন কেন কিনলাম? আমার খুব খারাপ স্বভাব হল কোন কিছু কেনার আগে সেটা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য ঘাঁটাঘাঁটি করা, এটা না করে কোন জিনিস কিনতে পারিনা। এই স্বভাবটা অবশ্য নতুন কোন জায়গায় বেড়াতে যাবার আগেও হয়। এই খারাপ স্বভাবের কারণেই জীবনে হুট করে তেমন কোন কাজ করতে পারিনি। একই কারণে অ্যান্ড্রয়েড কেনার চিন্তাটা মাথায় গত বছর আসলেও বিভিন্ন খোঁজ খবর নিয়ে কিনতে কিনতে এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত গড়ায়। আগে থেকেই অ্যান্ড্রয়েডের প্রতি একটা আকর্ষণ ছিল – হয়তোবা লিনাক্স দিয়ে তৈরি বলেই। তাই গবেষনা শুরু করলাম কোন অ্যান্ড্রয়েডটা আমার জন্য উপযোগী হবে – সাধ আর সাধ্য দুটোকেই তো মেলাতে হবে। দীর্ঘ সময়ের গবেষনার ফলাফল – সনি এরিকসন এক্সপেরিয়া আর্ক এস।

এইটা আমার কেনা এক্সপেরিয়া আর্ক এস এর ছবি না, এটা নেটে পাওয়া ছবি। তবে আমারটা হুবহু এইরকম দেখতে। (ক্যামেরা বের করে, সেটা দিয়ে ফোনের ছবি তুলে, সেই ছবি ডেস্কটপে ট্রান্সফার করে, গিম্পে হালকা পাতলা কাটাছিটা করে ব্লগে দেয়ার যে হ্যাপা, তার চেয়ে নেট ঘেঁটে ছবি বের করাটা আরামদায়ক। সে জন্যই এই ব্যবস্থা।)
এবার আগের প্রশ্নটার জবাব দেই যে কেন সনি এরিকসন পছন্দ করলাম। পছন্দ করার পেছনে মূল কারণ তিনটা। প্রথমতঃ আমার কাছে সনি এরিকসনের ফোন সেটগুলোকে খুবই স্টাইলিশ বলে মনে হয়। সে তুলনায় এইচটিসি, মটোরলা বা এলজি’র সেটগুলোকে একেবারেই গতানুগতিক লাগে – হাজারটা ফোন সেটের ভীড়ে এগুলোকে আলাদা করবার মত তেমন কোন বৈশিষ্ট্য চোখে পড়েনা। স্যামসাংয়ের ফোন সেটগুলোর আবার অন্য সমস্যা – এগুলো দেখতে আইফোনের কপি বলে মনে হয়। সেদিক থেকে সনি এরিকসনের সেটগুলোর স্বতন্ত্র একটা চেহারা আছে। দ্বিতীয়তঃ এক্সপেরিয়া আর্ক সিরিজ জিঞ্জারবার্ড নিয়ে আসলেও খুবই দ্রুত অফিসিয়ালি সেগুলোকে আইসক্রিম স্যান্ডউইচে আপগ্রেড করা হবে। যেখানে স্যামসাং গ্যালাক্সি এস টু ছাড়া অন্যগুলোতে আইসক্রিম স্যান্ডউইচে আপগ্রেড করবেনা। তৃতীয়তঃ বাংলা ফন্ট আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আমি বাংলা সাইটগুলোতে ঘুরাঘুরি করি, নিজের ব্লগে বাংলায় লিখি, ফেসবুক-টুইটার-ইমেইল সবখানেই বাংলা লিখি এবং পড়ি। তাই আমার ফোন সেটে বাংলার সাপোর্ট থাকা জরুরি। নেট ঘাঁটাঘাঁটি করে যা বুঝলাম যে এক্সপেরিয়া ছাড়া অন্য সেটগুলো বাই ডিফল্ট বাংলা সাপোর্ট করেনা। বেশ ঝামেলা করে সাপোর্ট করাতে হয়। সেদিক থেকে এক্সপেরিয়া একদমই ঝামেলা মুক্ত -শুরু থেকেই ঝকঝকে বাংলা ফন্ট বাংলা দেখা যায়। নিচের ছবিগুলো দেখুন – আমার এক্সপেরিয়ার সিস্টেম ল্যাংগুয়েজ ইংলিশের পরিবর্তে পরিস্কার বাংলায় দেখা যাচ্ছে (বড় করে দেখতে ছবিগুলো ক্লিক করুন)।
তাছাড়া ইন্টারনেটেও খুব পরিস্কার বাংলা দেখা যায়। নিচে এক্সপেরিয়া আর্ক এস থেকে আমার নিজের সাইটের বাংলা পোস্টের একটা স্ক্রিনশট দিলাম। এ-কার, ও-কার কিংবা যুক্তাক্ষর – সবই একদম ঠিকমতই পড়া যাচ্ছে।
এক্সপেরিয়া আর্ক এস আর গ্যালাক্সি এস টু পাশাপাশি তুলনা করলে কেবলমাত্র প্রসেসর আর মেমরি ছাড়া বাকি সবদিক দিয়েই এক্সপেরিয়া আর্ক এস এগিয়ে। এক্সপেরিয়া আর্ক এস হাতে নিয়ে আমি বেশ সন্তুষ্ট। খুবই পাতলা এবং হালকা এই ফোনটার ডিসপ্লে খুবই ঝকঝকে। তাছাড়া ৮ মেগাপিক্সেলের এইচডি ক্যামেরাতে সনি তাদের সাইবার শটের অনেক ব্যাপার-স্যাপার ঢুকিয়ে দিয়েছে। আর বরাবরের মতই মিউজিক প্লেয়ার হিসেবে এটা বেশ দারুণ – পরিস্কার গানের আওয়াজ শোনা যায়। সমস্যা খালি একটাই – ফোনটার সামনের দিকে নীচে যে তিনটা বাটন আছে সেগুলোর ভেতর অন্যান্য ফোন সেটের মত কোন বাতি নেই, কেবল পাশ দিয়ে ছোট দুটো লেড আছে। ফলে অন্ধকারে কেবল মাত্র মাসল-মেমরির উপর নির্ভর করে ফোনটা ব্যাবহার করতে হবে। তবে তিনটা বাটনের কাজ মনে রাখা নিশ্চয়ই কঠিন কোন কাজ না। অন্তত এতটুকু সামর্থ্য আমার আছে বলেই বিশ্বাস করি!
এই ছিল আমার আজকের পোস্ট – আমার পুরো মোবাইল জীবন আর পয়লা অ্যান্ড্রয়েডের কাহিনী নিয়ে। বোনাস হিসেবে একটা তথ্য দিয়ে যাই। যারা অ্যান্ড্রয়েডে বাংলা লিখতে চান তারা মায়াবী কিবোর্ড ইন্সটল করে দেখতে পারেন। ফোনেটিক কিবোর্ড – ব্যবহারে তেমন ঝামেলা নেই – সবচেয়ে বড় কথা এটা ফ্রি। অনেক দিন ফোনেটিক কিবোর্ড ব্যবহার করা হয়না বলে কি লেআউটটাতে অভ্যস্ত হতে কিছুটা সময় লাগছে আমার – তবে এই সমস্যাটাও সাময়িক বলেই আমার বিশ্বাস!









Pingback: … এবং আইসক্রিম স্যান্ডউইচ! | Adnan's Den